কলকাতা মেট্রোর ইতিহাস(KOLKATA METRO )
কলকাতা মেট্রোর ইতিহাস
"কলকাতা মেট্রো ভারতের প্রথম এবং প্রাচীনতম মেট্রো পরিষেবা যা ১৯৮৪ সালে শুরু হয়েছিল। বর্তমানে এটি দেশের চতুর্থ ব্যস্ততম মেট্রো সিস্টেম, যার ৫টি সচল লাইনে মোট ৫৮টি স্টেশন রয়েছে। এটি মূলত তার ঐতিহ্যবাহী
কলকাতা মেট্রো ভারতের রেলওয়ে ইতিহাসের এক সোনালী অধ্যায়। এশিয়ার পঞ্চম এবং ভারতের প্রথম মেট্রো হিসেবে এর যাত্রা পথটি ছিল চ্যালেঞ্জিং কিন্তু অনুপ্রেরণামূলক।
স্বপ্নের শুরু (১৯২৪ - ১৯৬৯)
কলকাতা মেট্রোর পরিকল্পনা কিন্তু স্বাধীনতার অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছিল।
১৯২৪ সাল: ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ার হার্লে ডালরিম্পল-হাই প্রথম কলকাতায় ভূগর্ভস্থ রেলের প্রস্তাব দেন। কিন্তু তখন তা বাস্তবায়িত হয়নি।
১৯৬৯ সাল: কলকাতার ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা সামলাতে 'মেট্রোপলিটন ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট' (MTP) তৈরি করা হয়। ফরাসি বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় ৫টি রুটের পরিকল্পনা করা হয়।
ভিত্তিপ্রস্তর এবং নির্মাণ (১৯৭২ - ১৯৮৪)
২৯ ডিসেম্বর, ১৯৭২: তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী কলকাতা মেট্রোর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
নির্মাণ পদ্ধতি: তখন আধুনিক টিবিএম (TBM) মেশিন ছিল না। 'কাট অ্যান্ড কভার' (Cut and Cover) পদ্ধতিতে রাস্তা খুঁড়ে বক্স বানিয়ে মেট্রো রেলের টানেল তৈরি করা হয়েছিল।
৩. ভারতের প্রথম মেট্রোর যাত্রা (২৪ অক্টোবর, ১৯৮৪)
এটি ছিল ঐতিহাসিক দিন। ভবানীপুর (বর্তমানে নেতাজি ভবন) থেকে এসপ্ল্যানেড পর্যন্ত মাত্র ৩.৪ কিমি পথে ভারতের প্রথম মেট্রো ছুটল। কলকাতায় ইতিহাস সৃষ্টি হলো।
মেট্রোর বিস্তার (১৯৯৫ - ২০১০)
১৯৯৫ সাল: দমদম থেকে টালিগঞ্জ পর্যন্ত সম্পূর্ণ অংশটি চালু হয়। এটিই ছিল কলকাতার প্রথম উত্তর-দক্ষিণ করিডোর।
২০০৯ - ২০১০: টালিগঞ্জ থেকে আরও দক্ষিণে গড়িয়া (কবি সুভাষ) পর্যন্ত মেট্রো সম্প্রসারিত হয়। এটি এলিভেটেড বা উড়ালপথের ওপর নির্মিত।
৫. ইস্ট-ওয়েস্ট এবং জোকা-বিবাদী বাগ মেট্রো (২০২০ - ২০২৪)
কলকাতার যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে যখন গঙ্গার তলা দিয়ে মেট্রো চালানোর পরিকল্পনা করা হয়।
২০২০ সাল: সল্টলেক সেক্টর ৫ থেকে স্টেডিয়াম পর্যন্ত ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো (Green Line) উদ্বোধন হয়।
২০২৪ সাল (ঐতিহাসিক বছর): মার্চ মাসে গঙ্গার তলার টানেল দিয়ে হাওড়া ময়দান থেকে এসপ্ল্যানেড রুটে বাণিজ্যিকভাবে মেট্রো চলাচল শুরু হয়। হাওড়া মেট্রো স্টেশনটি ভারতের গভীরতম মেট্রো স্টেশনে পরিণত হয়।
কলকাতা মেট্রো সম্পর্কে কিছু চমকপ্রদ তথ্য:
প্রথম চালক: তপন কুমার নাথ ও সঞ্জয় শীল ছিলেন ভারতের প্রথম মেট্রো ট্রেনের চালক।
গভীরতা: গঙ্গার নিচে ৩৩ মিটার (প্রায় ১০ তলা সমান) গভীর দিয়ে এই মেট্রো চলে।
রেলওয়ে জোন: ২০১০ সালে কলকাতা মেট্রোকে ভারতীয় রেলের ১৭তম জোন হিসেবে মর্যাদা দেওয়া হয়।
কলকাতা মেট্রোর বিভিন্ন লাইন ও রুটসমূহ:
লাইন ১: ব্লু লাইন (দক্ষিণেশ্বর – কবি সুভাষ): এটি কলকাতার সবথেকে পুরনো এবং ব্যস্ততম রুট, যা উত্তর থেকে দক্ষিণ কলকাতাকে মধ্য কলকাতার সাথে যুক্ত করে।
লাইন ২: গ্রীন লাইন (হাওড়া ময়দান – সল্টলেক সেক্টর ৫): এই লাইনটি হুগলি নদীর তলদেশ দিয়ে ঐতিহাসিক সুড়ঙ্গ পথে হাওড়াকে সল্টলেকের সাথে সরাসরি যুক্ত করেছে।
লাইন ৩: পার্পল লাইন (জোকা – মাঝেরহাট / এসপ্ল্যানেড): এই রুটটি দক্ষিণ কলকাতার জোকা অঞ্চলের সাথে মূল শহরের সংযোগ স্থাপন করেছে।
লাইন ৪: ইয়েলো লাইন (নোয়াপাড়া – জয় হিন্দ/এয়ারপোর্ট): এই লাইনটি দমদম বিমানবন্দর বা এয়ারপোর্ট এলাকার সাথে সংযোগ তৈরির জন্য নির্মিত।
লাইন ৬: অরেঞ্জ লাইন (কবি সুভাষ – হেমন্ত মুখোপাধ্যায়): এই রুটটি নিউ গড়িয়া (কবি সুভাষ) থেকে ইএম বাইপাস হয়ে সল্টলেক এবং ভিআইপি রোডের দিকে যাতায়াত সহজ করেছে।
আপনি যদি এখন কলকাতা মেট্রোয় ভ্রমণের পরিকল্পনা করেন, তবে নিচের তথ্যটি অবশ্যই মনে রাখবেন:
ব্লু লাইন (দক্ষিণেশ্বর - কবি সুভাষ): এই লাইনটি বর্তমানে সম্পূর্ণভাবে সচল এবং এটিই কলকাতার ব্যস্ততম রুট।
গ্রীন লাইন (হাওড়া ময়দান - সল্টলেক সেক্টর ৫): এই লাইনটিও এখন পুরোপুরি চালু এবং এটি গঙ্গার তলা দিয়ে যাতায়াতের জন্য জনপ্রিয়।
অন্যান্য লাইন (পার্পল ও অরেঞ্জ লাইন): এই লাইনগুলো বর্তমানে 'আংশিকভাবে চালু' রয়েছে। অর্থাৎ, এই রুটগুলোর সবকটি স্টেশন এখনও জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়নি; নির্দিষ্ট কিছু স্টেশনের মধ্যেই এখন ট্রেন চলাচল করছে।



Comments
Post a Comment